জুয়াখেলা, ষাড়ের লড়াই, ভাঙ্গারী দোকান, ভারতীয় পণ্যসহ বিভিন্ন অবৈধ প্রতিষ্টান থেকে অনৈতিকভাবে অর্থ গ্রহনের অভিযোগ। বাদী ও আসামিদের মনে করতেন মক্কেল। পেশাগত জীবনে ২৪টি অপরাধ করেও ছিলেন বেপরোয়া
ঢাকার মোহাম্মদপুরের রামচন্দ্রপুর মৌজায় আড়াই কাঠা জমির ওপর রয়েছে তিনতলা বাড়ি। এছাড়া একই এলাকায় ৫ কাঠার ওপর রয়েছে নির্মানাধীন ১০ তলা ভবন। উত্তরায় স্ত্রীর সাথে যৌথ নামে ১৩ শতাংশের ওপর টিন সেড বাড়ি, রামপুরায় রয়েছে তিন কাঠার ওপর আরো একটি বাড়ি। নিজ গ্রাম ময়মনসিংহের ভালুকার হরিবাড়ি এলাকায় রয়েছে ৯ একর জমি (যা বনবিভাগের দখলে রয়েছে)। ভালুকার বিরুনীয়ায় ২ একর জমির ওপর গড়ে তুলেছেন নিজ নামে ‘সায়েদুর রহমান স্কুল এন্ড কলেজ’। এছাড়াও একই এলাকায় রয়েছে তিন একর আবাদি জমি। এসব সম্পদের মালিক একজন পুলিশ পরিদর্শক। তিনি মো: সায়েদুর রহমান। গত ১৮ জানুয়ারি ২০২২ সাল থেকে নেত্রকোনা জেলার ডিবিতে কর্মরত ইন্সপেক্টর সায়েদুর রহমান। চরম দুনীতিবাজ এই পুলিশ কর্মকর্তার দুনীতিসহ নানা অপরাধে সম্পৃক্ত থাকার বিষয় তদন্ত করছে পুলিশ সদর দফতর ও দুর্নতি দমন কমিশন (দুদক)।
পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে,বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের সময় ছাত্রদের গ্রেফতারসহ হয়রানিতে বেপরোয়া ছিলেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। নেত্রকোনা জেলার সাধারন ছাত্ররা আন্দোলনের সময় তার মাধ্যমে নির্যাতনে শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ডিবিতে কর্মরত ইন্সপেক্টর সায়েদুর রহমান নেত্রকোনা জেলার সাবেক পুলিশ সুপার ফয়েজ আহমেদের কালেক্টর হিসেবে সকলের কাছে পরিচিত। আওয়ামীলীগ সরকারের সময় বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার ও হয়রানী করতে সাবেক এসপি ফয়েজ আহমেদ ডিবির পুলিশ কর্মকর্তা সায়েদুরকে ব্যবহার করতেন বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পেয়েছে পুলিশ সদর দফতর ও দুদকের কর্মকর্তারা।
এছাড়াও বেনামে তার শতকোটির বেশি টাকার সম্পদ রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পুলিশ সদরদপ্তর সূত্র জানায়, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানের সঙ্গে যৌথ মালিকানায় সায়েদুরের রয়েছে নেত্রকোনায় বেশ কয়েকটি জমি। কৃষকের সন্তান সাইয়েদুর রহমান এসব সম্পদ করতে গিয়ে কর্মস্থল এলাকায় জুয়াখেলা, ষাড়ের লড়াই, ভাঙ্গারী দোকান, ভারতীয় পণ্যসহ বিভিন্ন অবৈধ প্রতিষ্টান থেকে অনৈতিকভাবে অর্থ অথবা ঘুষ গ্রহনের মাধমে। পুলিশের প্রতিবেদনেই উঠে এসেছে পেশাগত জীবনে ২৪টি লঘু অপরাধেও অভিযুক্ত পুলিশের এ কর্মকর্তা।
পুলিশের এ গোয়েন্দা কর্মকর্তা আসামিদেরকে মক্কেল মনে করতেন। যে আসামি যত দাগী সায়েদুরের কাছে তার কদর ছিলো বেশি। যে আসামি কালো টাকার মালিক কিংবা সম্পদশালী সেই আসামিকে তিনি বেশি সমীহ করতেন। প্রশয় দিতেন। ওইসব আসামিদের কখনো গ্রেফতারের ভয় আবার কখনো তাদেরকে আইনের অপব্যবহার করে অনৈতিক সুবিধা দিয়ে হাতিয়ে নিতেন কোটি কোটি টাকা।
সায়েদুরের কাছে প্রতিকার চাওয়া ব্যক্তিদের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে উল্টো তাদের সাথে প্রতারণারও অভিযোগ রয়েছে পুলিশের এ গোয়েন্দা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
একজন অন্যতম ভুক্তভোগী কুমিল্লার বরুড়া মোবদাফরগঞ্জের বাসিন্দা ইউসুফের পুত্র রাব্বি হোসেন রাব্বি। ময়মনসিংহ রেঞ্জ ডিআইজির কাছে কাছে এক আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে একটি হত্যা মামলায় তার বাবা ও চাচাসহ মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ৪ জনকে খালাস করার অঙ্গীকারে নেত্রকানার পূর্বধলার শেরে আলম নামে এক প্রতারককে তারা নগদ ১৬ লাখ টাকা ও ২৭ লাখ টাকার চেক প্রদান করেন। টাকা ও চেক নেয়ার পর ওই প্রতারক যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। এ বিষয়ে নেত্রকোনা পুলিশ সুপারের কাছে আবেদন করেন তিনি। বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব পান নেত্রকোনা ডিবির তৎকালীন পরিদর্শক সায়েদুর রহমান ও এসআই যুবরাজ। তারা প্রতারক শেরে আলমকে গ্রেফতারও করেন। প্রতারক শেরে আলম সবকিছু স্বীকার করেন। একইসাথে ১৬ লাখ টাকার বিপরীতে নগদ ২০ হাজার টাকা প্রদান করেন। বাকি টাকা ও ২৭ লাখ টাকার দু’টি চেকের বিষয়ে স্ট্যাম্পে লিখিত দেন। একমাসের মধ্যে টাকা ফেরতের বিষয়ে স্ট্যাম্পে অঙ্গীকার করে প্রতারক। তখন ২৭ লাখ টাকার চেক দু’টিও ফেরত দেয় শেরে আলম। যা ডিবির কর্মকর্তা সায়েদুর রহমান নিজের কাছে রেখে দেন।
ভুক্তভোগী রাব্বি বলেন, এ সময় সায়েদুর ও যুবরাজ বলেন, টাকা দেয়া শেষ হলে টাকা ও চেক ও ডকুমেন্টসগুলো আমাদের ফেরত দিবেন। কিন্তু সেগুলো আমাদের ফেরত না দিয়ে রহস্যজনক কারনে প্রতারক শেরে আলমকেই গোপনে দিয়ে দেন। প্রতারক সেই চেক ও ডকুমেন্টসগুলো দিয়ে উল্টো আমাদের নামেই নেত্রকোনা আমলি আদালতে একটি মিথ্যা মামলা দায়ের করেন। এ মামলার কারনে পুলিশ ও গ্রেফতারের ভয়ে উল্টো আমাদেরই পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সায়েদুর রহমান বলেন, তার অধিনস্ত এসআই যুবরাজের কাছে রক্ষিত ছিলো ভুক্তভোগী রাব্বিদের চেক ও সকল ডকুমেন্টস। যুবরাজই তা প্রতারক শেরে আলমকে হস্তান্তর করেছে। তিনি আরো বলেন, ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে এসআই যুবরাজের বিরুদ্ধে মামলা করায় তিনি হয়তো ক্ষিপ্ত ছিলেন।
সায়েদুর নিজের সম্পদ প্রসঙ্গে বলেন, মোহাম্মদপুরের সম্পদ তার মায়ের দান করা। গ্রামের সম্পদ পৈত্রিকভাবে প্রাপ্ত। ঢাকার মোহাম্মদপুরের নির্মাণাধীন ১০ তলা ভবন প্রসঙ্গে তার জানা নেই। অন্যান্য প্রসঙ্গেও এড়িয়ে যান কৌশলী পুলিশের এ কর্মকর্তা।





