আজ ১৫ আগস্ট, গণতন্ত্রের মাতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন। ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুর জেলায় ইস্কান্দার মজুমদার ও তৈয়বা মজুমদারের ঘরে তার জন্ম। তাদের আদিবাড়ি ফেনীতে। তিনি দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে এবং পরে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়াশোনা করেন। ১৯৬০ সালে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিয়ে হয়।
এ উপলক্ষে দলের পক্ষ থেকে কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে ঢাকাসহ দেশব্যাপী দলীয় কার্যালয়, মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল। ঢাকায় নয়াপল্টনস্থ বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আজ ১৫ আগস্ট শনিবার বেলা ১১টায় মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠানে বিএনপির সিনিয়র নেতারা উপস্থিত থাকবেন। ঢাকাসহ দেশব্যাপী বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সব পর্যায়ের নেতাকর্মী-সমর্থকদের মিলাদ ও দোয়া মাহফিলগুলোয় অংশগ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গতকাল শুক্রবার এসব কথা বলা হয়।
বাংলাদেশের আপসহীন নেত্রী বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গত বছর ৩০ ডিসেম্বর অগণিত ভক্ত রাজনৈতিক সহযোদ্ধা, সহকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে যান। ওইদিন ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। এ সময় তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। সেদিন এভারকেয়ার হাসপাতালে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, এ সংবাদটা নিয়ে সবার সামনে দাঁড়াতে হবে ভাবিনি। আমরা এবারও ভেবেছিলাম তিনি আগের মতো সুস্থ হয়ে উঠবেন। আমরা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলছি, আজ ভোর ৬টায় গণতন্ত্রের মাতা, আমাদের অভিভাবক, জাতির অভিভাবক আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।
মৃত্যুর সময় বেগম খালেদা জিয়ার শয্যাপাশে ছিলেন তার জ্যেষ্ঠ ছেলে ও বিএনপির তখনকার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ সময় হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান এবং প্রয়াত ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমান সিঁথি। স্বজনদের মধ্যে ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার ও তার স্ত্রী, বড় বোন সেলিনা ইসলামসহ পরিবারের অন্য সদস্যরাও শেষ সময়ে হাসপাতালে ছিলেন। এছাড়া মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের চিকিৎসকরাও উপস্থিত ছিলেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে লিভার সিরোসিস, আর্থ্রাইটিস ও ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। পাশাপাশি কিডনি, ফুসফুস, হার্ট ও চোখের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাও ছিল তার।
হার্ট ও ফুসফুসে সংক্রমণ ধরা পড়ার পর মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শে গত বছর ২৩ নভেম্বর তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. শাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বে বাংলাদেশ, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও অস্ট্রেলিয়ার বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ড তার চিকিৎসা তদারকি করেন। আগস্ট মাসের শুরুতে চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় পরবর্তী সময়ে তা আর সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়া ‘আপসহীন নেত্রী’ উপাধি পেয়েছিলেন। চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে জীবনের পরম সত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করেন বেগম খালেদা জিয়া। রাজনীতিকদের জীবনে উত্থান-পতন থাকে। মামলা-মোকদ্দমা, গ্রেপ্তার, কারাবাস, নির্যাতন, প্রতিপক্ষের আক্রমণ- এসবও তাদের জীবনে অভাবনীয় নয়।
বেগম খালেদা জিয়াও চরম পর্যায়ের নির্যাতন সহ্য করেছেন। সহ্য করেছেন স্বামী-সন্তান হারানোর গভীর শোক আর দীর্ঘ রোগযন্ত্রণা। রাজনৈতিক জীবনে মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত ছাড়াও প্রতিপক্ষের ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা, বিদ্বেষ, লাঞ্ছনা ও নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া। খালেদা জিয়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন, যিনি ১৯৯১ সাল থেকে তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকারপ্রধান ছিলেন। জিয়াউর রহমান বীর-উত্তম রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর বেগম জিয়া ফার্স্টলেডি হিসেবে তার সঙ্গে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সফরে অংশ নেন। এ সময় তিনি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার এবং নেদারল্যান্ডসের রানি জুলিয়ানাসহ বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
১৯৮১ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়ার মৃত্যুর পর ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি তিনি বিএনপিতে সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দেন। ১৯৮৩ সালের মার্চে তিনি ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। বেগম খালেদা জিয়া দেশের রাজনীতিতে একটি অনন্য রেকর্ডের অধিকারী। তিনি কখনো কোনো নির্বাচনে কোনো আসনে পরাজিত হননি। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি পাঁচটি পৃথক আসন থেকে নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনেও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা তিনটি আসনেই বিজয়ী হন।





