অর্ধযুগ ধরে চলছে বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা শিক্ষা কাউন্সিলের রেজিস্ট্রার জাহাঙ্গীর আলমের অবৈধ সম্পদ,পাচার ও জালিয়াতির অনুসন্ধান! কমিশন আসে কমিশন যায়। কর্মকর্তা বদল হয়। পদোন্নতিও হয় কর্মকর্তাদের। অবসরে চলে যান। মৃত্যুবরণ করেন। এমনকি পলায়ন ঘটে স্বৈরশাসক গোষ্ঠিরও। অথচ নড়েনা ফ্যাসিবাদের আছড়ে থাকা স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের ‘হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা শিক্ষা কাউন্সিল’র রেজিস্ট্রার জাহাঙ্গীর আলমগংদের দুর্নীতির ফাইল। তার চাকরিও বরং আরো মজবুত হয়। আর দুর্নীতি দমন কমিশনে পাথরের মতো হয়ে পড়ে থাকে তার তাদের দুর্নীতির নথি।
নিবিড় অনুসন্ধানে দেখা যায়, দুদকের শতভাগ তফসিলভুক্ত একটি অপরাধকে (আত্মসাৎ,অবৈধ সম্পদ ও জালিয়াতি) কৌশলে করা হয়েছে দু’টি ভাগ। জালিয়াতির অপরাধ থেকে দায়মুক্তি দিয়ে এই অংশটি পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে এখতিয়ার বহির্ভুত এবং অভিযোগসংশ্লিষ্ট দফতরের কাছেই। আর ওই কর্মকর্তার অর্থ আত্মসাৎ ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের অংশটি অনুসন্ধানের নামে অর্ধযুগ ধরে ফেলে রাখা হয়েছে দুদকে। অনুসন্ধান নিষ্পত্তির কথিত ‘সময়সীমা’কে ঠুঁটোজগন্নাথ বানিয়ে নির্বিঘ্নে চাকরি করার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে দুর্নীতিবাজ রেজিস্ট্রার জাহাঙ্গীর আলমকে। আর এভাবেই ব্যক্তি রেজিস্ট্রারের ‘ছোট্ট’ দুর্নীতি অনুসন্ধান নিষ্পন্ন করতেই আইনত: স্বশাসিত,স্বাধীন আর পরাক্রমশালী দুদক আজ নিপতিত এক অদ্ভুত আড়ষ্টতায়।
প্রাপ্ত তথ্য মতে, দুর্নীতি দমন কমিশন, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের তৎকালিন পরিচালক মো: মাহমুদ হাসান দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, নোয়াখালি’র তৎকালিন উপ-পরিচালক বরাবর ‘প্রতিবেদন’ সংক্রান্ত একটি ফরোয়ার্ডিং দেন।
অনুসন্ধানটি ছিলো (এক) বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথি বোর্ড,ঢাকা’র রেজিস্ট্রার কাম সেক্রেটারি, স্বঘোষিত ‘ডাক্তার’ জাহাঙ্গীর আলমের দুর্নীতি,জালিয়াতি,অর্থ আত্মসাৎ, অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থ পাচার সংক্রান্ত। (দুই) ‘আমিন অ্যান্ড মোমিন ডেভেলপমেন্ট লি:.ঢাকা’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: তোবারক হোসেন সংক্রান্ত। দুদক, সজেকা, নোয়াখালি কার্যালয়ের তৎকালিন সহকারি পরিচালক (বর্তমানে উপ-পরিচালক, চট্টগ্রাম) সুবেল আহমেদ ২০২০ সালের ৩১ আগস্ট অনুসন্ধান প্রতিবেদন (স্মারক নং-১৫৬৭) জমা দেন। একই বছর ২ নভেম্বর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দুদকের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের তৎকালিন পরিচালক মো: মাহমুদ হাসান মহাপরিচালক (তদন্ত-২)কে প্রতিবেদনটি ‘ফরোয়ার্ড’ (স্মারক নং- ০০.০১.৭৫০০.৬২১.০১.২৮৬.১৮/৯১৫/১(২) করেন। ফরোয়ার্ডিংয়ের ৪ নম্বর অনুচ্ছেদে তিনি লেখেন, ‘অনুসন্ধান কর্মকর্তা এবং তদারককারী কর্মকর্তার প্রস্তাব বিবেচনা করে (১) ডা: মো: জাহাঙ্গীর আলম (২) মো: তোবারক হোসেন পরষ্পর যোগসাজশে প্রতারণামূলকভাবে মানিলন্ডারিংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত অপরাধ ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমেলব্ধ অর্থের উৎস গোপনের লক্ষ্যে ১ নম্বর ক্রমিকের ব্যক্তিকে জ্ঞাত আয়ের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ ১,১৩,১২,১১০ টাকার সম্পদ অর্জন ও ভোগদখলসহ দলিলে মূল্য কম দেখিয়ে (প্রকৃতপক্ষে বেশি লেনদেন করে), ভুয়া স্বর্ণ বিক্রয় এবং বাড়ি নির্মাণে খরচ কম দেখিয়ে (প্রকৃতপক্ষে বেশি খরচ করে) স্থানান্তর,হস্তান্তর এবং রূপান্তরের মাধ্যমে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২৭(১) ধারা, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারা ও দণ্ডবিধির ১০৯ ধারা তৎসহ দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭ এর ৫(২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। ২ নং ব্যক্তি ফ্ল্যাট ক্রয়ে মূল্য কম দেখানো ও সরকারি ৫,৪১,৩৮০/-টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে সহায়তা করায় মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২ এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারা ও দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন বিধায় তাদের বিরুদ্ধে একটি নিয়মিত মামলা রুজুর সুপারিশ বিবেচনা করা যেতে পারে। সহকারি রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ সংক্রান্ত প্রদানকৃত অভিজ্ঞতার সনদ ও সহকারি রেজিস্ট্রার থেকে পদোন্নতিপ্রাপ্ত হয়ে ‘রেজিস্ট্রার’ পদের দায়িত্ব পালনের বিষয়সমুহ বিধিসম্মত হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখবার জন্য সচিব, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে পত্র দেয়া যেতে পারে।’
প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী, জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে দুদক অদ্যাবধি কোনো মামলা করেনি। বরং কৌশলে দায়মুক্তি দিযে দেয়া হয়েছে অভিযোগে উল্লেখিত ‘জাল-জালিয়াতি’ অংশ থেকে। স্বীয় তফসিলভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও দুদক জাল-জালিয়াতির বিষয়ে নিজে কোনো ব্যবস্থা নেয় নি।
জানাগেছে, বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা শিক্ষা কাউন্সিল (অধুনালুপ্ত বাংলাদেশ হোমিও বোর্ড,ঢাকা) রেজিস্ট্রার জাহাঙ্গীরকে দায়মুক্তি দিতে দুদক সুকৌশলে তার সনদ জালিয়াতির বিষয়ে ‘ব্যবস্থা’ নিতে পাঠিয়ে দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগে। যদিও সরকারি পদধারী কর্মকর্তার জালিয়াতির অভিযোগ অনুসন্ধান-তদন্তের একক এখতিয়ার দুদকের। কিন্তু সেই তফসিলকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ২০২৪ সালের ৩০ জুন বিষয়টি ফরোয়ার্ড করা হয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে। ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারকালিন দুদকের সচিব খোরশেদা ইয়াসমীনের স্বাক্ষরে সেই ফরোয়ার্ডিং (প্রকারন্তে দায়মুক্তি সনদ) পাঠানো হয়। আইনজ্ঞদের মতে যা সম্পূর্ণ ক্ষমতার অপব্যবহার। যা ১৯৪৭ সালের ২ নং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় শাস্তিযোগ্য।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, নিষিদ্ধঘোষিত আ’লীগের ঢাকা দক্ষিণের সহ-সভাপতি দিলীপ কুমার রায়ের (বর্তমানে পলাতক) তদবিরে জাল-জালিয়াতির অংশটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এবং ততোধিক জালিয়াতির আশ্রয়ে আ’লীগ নেতা দিলীপ কুমারের ক্যাডার জাহাঙ্গীর আলমকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকেও দায়মুক্তি দেয়া হয়। আর এর বিনিময়ে জাহাঙ্গীর আলমও দিলীপ রায়কে দিয়েছেন বিরাট ‘গুরুদক্ষিণা’। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে দিলীপের হয়ে কোমর বেঁধে কাজ করেন রেজিস্ট্রার জাহাঙ্গীর। চব্বিশের রক্তাক্ত অভ্যুত্থানকালে হাসিনার গুণ্ডা ও পুলিশ বাহিনী যখন পাখির মতো গুলি করে ছাত্র-জনতা হত্যা করছিলো সেই দলে নিষিদ্ধ আ’লীগ-যুবলীগার হিসেবে সশরীরে রাজপথে ছাত্রহত্যায় মেতে ওঠেন জাহাঙ্গীরও। সোশ্যাল মিডিয়ায়ও হন সোচ্ছার। সরকারি দায়িত্বে থেকে জাহাঙ্গীরতার ফেসবুক পোস্টে বলেন, ‘প্রসঙ্গ: কোটা বিরোধী আন্দোলন- দেশদ্রোহী,স্বঘোষিত রাজাকার ও রাজাকারের বাচ্চাদের তালিকা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি-ডা: মো: জাহাঙ্গীর আলম, মহাসচিব, স্বাধীনতা হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা পরিষদ।’
এদিকে দুদকের অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জাহাঙ্গীরের অর্থ আত্মসাৎ, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং অর্থ পাচারের অভিযোগে আজ (বুধবার) পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণী ‘যাচাই-বাছাই’ চলছে এখনো। যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হতে আর কত বছর লাগবে ? জানতে চাইলে সম্ভাব্য কোনো সময়সীমাও দিতে পারলেন না অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট দুদক কর্মকর্তা।
যোগাযোগ করা হয় রেজিস্ট্রার জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ময়-মুরুব্বীদের দোয়ায় এখন আর কোনো অসুবিধা নেই। এখানো আছি চাকরিতে। মাঝে একটু সমস্যা হয়েছিলো।





