স্টাফ রিপোর্টার:
রাজধানীর অধিকাংশ বাণিজ্যিক ভবনেই অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী পার্কিং সুবিধা নেই। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সাম্প্রতিক বিশেষ অভিযানে দেখা গেছে, পরিদর্শন করা বাণিজ্যিক ভবনের ৮৬ দশমিক ২৩ শতাংশে নকশা অনুযায়ী পার্কিং ব্যবস্থা নেই। অনেক ভবনের বেজমেন্ট ও নির্ধারিত পার্কিং এলাকা দোকান, গোডাউন ও অন্যান্য বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা রাজধানীর তীব্র যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
রাজউকের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকার মোট ২ হাজার ৬৩৭টি ভবন পরিদর্শন করা হয়। এর মধ্যে মাত্র ৩৬৩টি ভবনে অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী পার্কিং সুবিধা পাওয়া গেছে, যা মোট ভবনের মাত্র ১৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ৫৩২টি ভবনে পার্কিং এলাকা থাকলেও তা সঠিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অন্যদিকে এক হাজার ৬৮টি ভবনের পার্কিং স্পেসে স্থায়ী কাঠামো নির্মাণ করে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এছাড়া ২১৬টি ভবনে অস্থায়ী স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। পরিদর্শনের সময় ৪৫৮টি ভবন কর্তৃপক্ষ কোনো অনুমোদিত নকশাই দেখাতে পারেনি।
গুলিস্তানের মার্কেটগুলোতেও অনিয়ম
রাজউকের পরিদর্শনে গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়া এলাকার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মালিকানাধীন চারটি মার্কেটেও গুরুতর অনিয়ম ধরা পড়ে। এগুলো হলো—ঢাকা ট্রেড সেন্টার, গুলিস্তান ট্রেড সেন্টার, ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেট-১ ও ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেট-২।
নকশা অনুযায়ী এসব ভবনের বেজমেন্ট পার্কিং হিসেবে ব্যবহারের কথা থাকলেও বাস্তবে সেখানে দোকান ও বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। ঢাকা ট্রেড সেন্টার ও ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেট-১ এর বেজমেন্টে স্থায়ী দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। নির্মাণাধীন গুলিস্তান ট্রেড সেন্টারের বেজমেন্টেও দোকান স্থাপন করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেট-২ এর তিনটি ভবনের বেজমেন্ট একসময় উদ্ধার করা হলেও বর্তমানে সেখানে আবারও দোকান নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
পার্কিং সংকটে বাড়ছে যানজট
পার্কিং সুবিধা না থাকায় গুলিস্তানের মতো ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকায় সড়কের ওপরই পণ্য ওঠানামা করতে হয়। মার্কেট-সংশ্লিষ্ট যানবাহন রাস্তার অংশ দখল করে রাখায় নিয়মিত যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে এবং ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।
রাজউকের বিশেষ অভিযান গত ২৭ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত পরিচালিত হয়। এ সময় গুলশান, বনানী, তেজগাঁও, প্রগতি সরণি, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, পান্থপথ, কারওয়ান বাজার, পল্টন ও মতিঝিলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ৪৪টি বিশেষ টিম সরেজমিনে পরিদর্শন চালায়।
মন্ত্রিপরিষদের নির্দেশনায় অভিযান
রাজধানীর যানজট নিরসনে চলতি বছরের মার্চে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিপরিষদের বিশেষ সভায় অনুমোদিত পার্কিং স্পেস দখলমুক্ত করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়। সভায় উল্লেখ করা হয়, অনেক ভবনের পার্কিং এলাকা নিয়মবহির্ভূতভাবে দোকান ও গুদাম হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় নগরবাসীকে সড়কে গাড়ি পার্কিং করতে হচ্ছে, যা যানজটের বড় কারণ।
এর পরিপ্রেক্ষিতে রাজধানীর ভবন ও বেজমেন্ট পার্কিংয়ের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত প্রতিবেদন দিতে রাজউককে নির্দেশ দেওয়া হয়।
বসুন্ধরা সিটির আবেদনও নাকচ
রাজউক সূত্রে জানা গেছে, পান্থপথের বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষ তাদের ১ হাজার ৮০০টি পার্কিং স্পেসের মধ্যে ১ হাজার ১৫০টি কমানোর আবেদন করেছিল। তবে মন্ত্রিপরিষদের বিশেষ সভায় সেই আবেদন নাকচ করা হয় এবং বেজমেন্ট পার্কিং অক্ষুণ্ন রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, বসুন্ধরা কর্তৃপক্ষ পরে সংশোধিত নকশার আবেদন করেছে, যা বিধি অনুযায়ী পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
উচ্ছেদ অভিযানে ১৩১ পার্কিং স্পেস উদ্ধার
পার্কিং এলাকায় গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নিতে রাজউক চারটি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে গত ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত সময় দেয়। নির্ধারিত সময়সীমা শেষে ১৬ এপ্রিল থেকে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়।
ঈদুল আজহার আগে রাজধানীর ১৬টি বহুতল ভবনের ১৩১টি পার্কিং স্পেস থেকে অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করা হয়েছে।
রাজউকের পরিচালক (প্রশাসন) তার প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, নকশা অনুযায়ী পার্কিং নিশ্চিত করতে চলমান কার্যক্রম সম্পন্ন করতে আরও প্রায় চার মাস সময় লাগতে পারে।
আবাসিক ভবনেও অভিযান
রাজউক জানিয়েছে, বাণিজ্যিক ভবনগুলোর পার্কিং দখলমুক্ত করার কার্যক্রম শেষ হলে দ্বিতীয় পর্যায়ে রাজধানীর আবাসিক ভবনগুলোতেও একই ধরনের চিরুনি অভিযান পরিচালনা করা হবে।
এ বিষয়ে রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন,
“যানজট নিরসনের স্বার্থে যেসব ভবনের পার্কিং স্পেসে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান চলছে। অনিয়মকারী ভবনের সংখ্যা অনেক হলেও পর্যায়ক্রমে সবগুলোতেই অভিযান পরিচালনা করা হবে।”





